দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে ১২৫ বছরের পুরানো মেহেরপুরের সাবিত্রী মিষ্টির কদর



একসময় মেহেরপুরের ব্রিটিশ কর্মচারী ও জমিদারদের রসনাকে তৃপ্ত করত ‘সাবিত্রী’ ও ‘রসকদম্ব’ নামের দুই মিষ্টি। এর পর অতিক্রান্ত হয়েছে দেড়শ বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু এর স্বাদে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো একইভাবে সমান জনপ্রিয় মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী বাসুদেবের এ মিষ্টি।

জানা যায়, ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে মেহেরপুরের বাসিন্দা বাসুদেব সাহা এ মিষ্টি উদ্ভাবন করেন। অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার পাঁচ মহকুমার মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক নগরী ছিল মেহেরপুর। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো নদীয়া জেলায় ভিন্নধর্মী ও ব্যতিক্রমী এ মিষ্টির পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এ মিষ্টির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে অন্যান্য মিষ্টির মতো রস নেই। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এগুলো প্রায় ছয় মাস সংরক্ষণ করা যায়। মজার ব্যাপার হলো, এগুলো যত পুরনো হয়, তত এর স্বাদ বাড়ে। ফলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়।

এ বিষয়ে কথা হলে বাসুদেবের নাতি বিকাশ কুমার সাহা জানান, জমিদার সুরেন কুমার বোসের বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে তার ঠাকুরদা প্রথম দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই ব্রিটিশ কর্মকর্তা-কর্মচারী, জমিদার বংশের মানুষসহ অমাত্যবর্গ ও সাধারণ মানুষ এ মিষ্টির গুণগ্রাহী হন। বাসুদেব সাহার কাছ থেকে তার ছেলে রবীন্দ্রনাথ সাহা এ মিষ্টি তৈরির কৌশল শেখেন। তার কাছ থেকে শেখেন তার দুই সন্তান বিকাশ কুমার সাহা ও অনন্ত কুমার সাহা। এখন তারা দুজন ‘বাসুদেব গ্র্যান্ড সন্স’ নামে এ মিষ্টির ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

তিনি জানান, মূলত দুধ আর চিনি এ মিষ্টির প্রধান উপকরণ। প্রথমে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দুধ জ্বাল দিতে হয়। দুধ ঘন হয়ে এলে নির্দিষ্ট সময়ে দিতে হয় পরিমাণমতো চিনি। এর পর তা জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে ছাঁচে মিষ্টি তৈরি হয়। এক কেজি দুধ থেকে সর্বোচ্চ ১০টি সাবিত্রী মিষ্টি তৈরি হয়। মানের স্বার্থে পুরো কাজটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়। মিষ্টির গুণগত মান ধরে রাখতে তারা কোনো কর্মচারী রাখেননি।

জানা যায়, এ মিষ্টি কিনতে প্রতিদিন স্থানীয় ক্রেতাদের থেকেও বাইরের ক্রেতারা বেশি ভিড় করেন। মেহেরপুরে এলে এ মিষ্টি কিনে নিয়ে যান দেশ-বিদেশের অনেকেই। আর তাদের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে তা চলে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, মধ্যপ্রাচ্যসহ বহু দেশে।

এ বিষয়ে অনন্ত কুমার সাহা জানান, প্রতিদিন এক মণেরও বেশি মিষ্টি তৈরি করতে হয়। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ২টার মধ্যে সব মিষ্টি শেষ হয়ে যায়। তবে মান ধরে রাখতে তারা বায়না পেলেও অতিরিক্ত মিষ্টি তৈরি করেন না।

জমিদার সুরেন কুমারের ভ্রাতুষ্পুত্র অভিজিত্ বোস (৬৫) জানান, তার পূর্বপুরুষরা অতিথিদের মন জয় করতে প্রথমে এ মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। বংশপরম্পরায় তারা এখনো এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। আর আশির অধিক বয়সের স্থানীয় বাসিন্দা হাসিব উদ্দিন জানান, তিনি ছোটবেলা থেকে এখনো প্রায় প্রতিদিন বাসুদেবের মিষ্টি খান। অথচ মিষ্টির স্বাদ ও মান একটুও বদলায়নি।

তথ্যসূত্র: নিউজ ২৪ 


Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes