মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী কুমড়ার-বড়ি তৈরীর ইতিকাহিনী



চাল কুমড়া বা চুন কুমড়া বা সাদা কুমড়া বা ভেতু কুমড়া একই জিনিসের অনেক নাম এবং এর সাথে মাষকলাইয়ের ডালই কুমড়ার-বড়ি তৈরীর প্রধান উপাদান। খাবারে আলাদা স্বাদ আনতে এই বড়ির জুড়ি মেলা ভার। কুমড়ার মিশ্রণ থাকায় এর নাম হয়েছে ‘কুমড়া-বড়ি’। মেহেরপুর অঞ্চলে প্রতিবছর শীতে চলে এই কুমড়া-বড়ি তৈরীর ধুম। এর সাথে মিশে আছে পরিবারের জন্য প্রেম, নিষ্ঠা, ভবিষ্যৎভাবনা, দায়িত্ববোধ, ভালবাসা, ত্যাগ, চেষ্টা, একাগ্রতা, ধৈর্য্য, আনন্দ,পরম্পরা এবং ঐতিহ্য ।

মেহেরপুরের নারীদের কাছে এই বড়ি দেয়ার কাজ শুধুই একটা খাবার তৈরী করা নয় । এটা একটা উৎসব, একটা পরম্পরা, একটা মিলনমেলা, একটা প্রতিযোগীতা, একটা পরীক্ষা এবং একটা দায়বদ্ধতার নাম ।

যে পরিমাণ পরিশ্রম, ভালবাসা, চেষ্টা, একাগ্রতা, ধৈর্য্য, নিষ্ঠা এবং প্রেম থেকে জন্ম হয় এক একটি বড়ির, তার মূল্যায়ন সামান্য কিছু টাকা দিয়ে করা সম্ভব নয়। একারণে মেহেরপুরের অধিকাংশ নারী এই জিনিসটিকে সামান্য অর্থমূল্যে বিক্রয় করতে চান না। আপনি যদি চান তবে এমনিই পেতে পারেন এটি অথবা আত্মীয়তার সম্বন্ধ থাকলে আপনাকে এটা দেয়া হবে অতিথি আপ্যায়ন হিসাবে অথবা উপঢৌকন হিসাবে। সমগ্র জেলাব্যাপি এই বড়ি দেয়া হলেও সামান্য কিছু দোকানে ছাড়া পুরো জেলায় কোথাও আপনি এই জিনিসটি কিনতে পারবেন না অর্থ দিয়ে, কিন্তু খঁজলে আপনি পাবেন প্রায় সকল বাড়িতে।

আসলে সব কিছু বিক্রির জন্য নয়। এটা সেই জিনিস যা বানানো হয় নিজের প্রিয় মানুষদের মুখের হাসির জন্য ।

তারপরও কিছু মানুষ ইদানিংকালে ব্যবসায়িক উদ্দ্যেশ্যে এই বড়ি তৈরী করছে। যার অনেকটা অংশ বিদেশেও যাচ্ছে । বাণিজ্যিক উদ্দ্যেশ্যে এই বড়ি তৈরী করে থাকে অল্প সামান্য কিছু পরিবার ।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কম-বেশী কুমড়া-বড়ি তৈরী করা হয়ে থাকে। তবে মেহেরপুর অঞ্চলের কথা বলা লাগছে আলাদাভাবে এ কারণে যে, সমগ্র জেলায় অসম্ভব জনপ্রিয় এই কুমড়া বড়ি। জেলার প্রতিটি গ্রামে, প্রায় প্রতিটি পরিবারে প্রতিবছর শীতে চলে এই কুমড়া-বড়ি তৈরীর ধুম। তবে ইদানিং কুমড়ার ফলন কম ও দাম বৃদ্ধির কারণে অনেকেই কুমড়ার পরিবর্তে কাঁচা পেঁপেও ব্যাবহার করা হয়ে থাকে । আর প্রচুর পরিশ্রম এবং আবহাওয়ার বিরুপতা বা অনিশ্চয়তার কারণে ইদানিং কালের আধুনিক কর্মজীবী নারীরা অার অাগের মত একাজে ততটা ইচ্ছুক নন ।

তবুও আজও এই অঞ্চলের মানুষের খাদ্যে বৈচিত্র্য আনতে ও রসনা বিলাসে শীত মৌসুমের তৈরী এই কুমড়া-বড়ি অনন্য। শীত মৌসুমে তৈরী এই কুমড়া বড়ি পরতর্তি শীত আসা পর্যন্ত সংগ্রহ করে রাখা হয় এবং সারা বছর বিভিন্ন প্রকার দেশীয় জাতের মাছ যেমন ইলিশ, পাকাল(বান) মলা(ময়া), পুঁটি, চিংড়ি, চেলা, কৈ, টেংরা, মাগুড়, শিং(জিয়ল), শৈল, পবদা, চ্যাং(টাকি) সহ পুকুরে চাষকৃত মাছ তেলাপিয়া, নাইলেটিকা, বাটা, রুই(নউচি), কাতলা, মৃগেল(মিরগী), সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প(গিলাছ কাপ), ব্ল্যাক কার্প, জাপানী রুই(পেটুক), সরপুঁটি ইত্যাদি যে কোন প্রকার মাছ ও সবজির সাথে রান্না করে খাওয়া যায় এই কুমড়া বড়ি। এছাড়া যে কোন প্রকার নিরামিষ খাবারের সাথেও খাওয়া যায় এই বড়ি। তরকারিতে স্বাদের বৈচিত্র্য আনতে ব্যবহার করা হয় এই বড়ি।

এ অঞ্চলের কুমড়ার বড়ি গুণগত মানে উন্নত হওয়ায় এর চাহিদা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। তবে এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ এটিকে শুধুমাত্র নিজেদের চাহিদামতোই তৈরী করে থাকে। এই অঞ্চলের প্রবাসীরা বিদেশ থেকেও তাদের মা-বোন স্ত্রীদের তৈরী বড়ি খেতে পথ চেয়ে থাকেন এবং কেউ দেশে আসলে তাকে বাড়ি থেকে কুমড়ার বড়ি আনার জন্য বলা হয়ে থাকে।

মূলত শীতের মৌসুমে অর্থাৎ অগ্রহায়ণ পৌষ ও মাঘ এই তিন মাস এই অঞ্চলের পরিবারগুলো কুমড়া-বড়ি তৈরীতে ব্যস্ত থাকে। কারণ এই সময়েই মাসকলাই এবং কুমড়া এই দুটিই একসাথে পাওয়া যায়। মাসকলাই যদিও সারাবছর সংরক্ষণ করা সম্ভব কিন্তু কুমড়া বেশিদিন ঘরে রাখা সম্ভব না হওয়ায় এই সময়ের মধ্যেই বড়ি দেয়া হয়।

পরিবারের নারীরা প্রথমে কুমড়া বা পেঁপে কেটে ঝিনুক খোল বা ছোট চামচ দিয়ে কুরে কুরে যত্ন করে কুমড়ার বা পেঁপের ঝুরি তৈরী করেন। তারপর তা ভাল করে পানিতে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে রেখে দেয়া হয়। এরই মাঝে মাশকলাই পাথরের চাকিতে ভেঙে পরিস্কার করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত । তারপর সাধারণত বাড়ির ছোট বড় নারী ও শিশুরা মিলে বিকালে নদীতে বা পুকুরে গিয়ে স্টিলের বা এলুমিনিয়ামের গামলা বা বাঁশের কঞ্চির তৈরী ছোট ডালি বা টোকা বা কুলা এবং পাটের বা সালফেটের বস্তায় ঘসে ঘসে অনেক সময় নিয়ে, অনেক যত্ন করে সম্পূর্ণ খোসা তুলে পরিস্কার সাদা করে ফেলে এই ডালগুলিকে। তারপর এই ডাল গুলিকে পানি ঝরিয়ে রাতে রেখে দেয়া হয়। পরের দিন খুব ভোরে উঠে অাগের দিনের তৈরী কুমড়ার বা পেঁপের শুকনা ঝুরির সাথে ঐ ছাল তোলা ডাল মিশিয়ে কেউ ঢেঁকিতে, কেউবা বড় হামান দিস্তাতে, কেউবা পাথরের চাকিতে আর ইদানিংকালে কেউবা মেশিনে বা মিলে পাঠিয়ে পিশায় করে অনেন। ঢেঁকিতে বা পাথরের চাকিতে পিশায় করা একটি অত্যন্ত কস্টসাধ্য কাজ। তবুও এই অঞ্চলের মা-বোন-দাদী-নানী-বৌ-ঝিরা বহু দিন ধরেই তাদের প্রিয় মানুষদের জন্য দিনের পর দিন এই কাজটি করে অাসছে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ।

এরপর শুরু হয় আর একটি কস্টসাধ্য কাজ। আর এটাই হচ্ছে আসল শিল্প। পিশায়কৃত ডাল ও ঝুরির মিশ্রণকে একটা মাটির অথবা এলুমিনিয়ামের অথবা স্টিলের গামলায় অল্প অল্প করে নিয়ে অনবরত মর্দন করা হয় যতক্ষন না মিশ্রণটি ধবধবে সাদা এবং তুলতুলে নরম হয়ে যায়। এই মর্দন করার দক্ষতার উপরই নির্ভর করে বড়ির আসল স্বাদ ও সৌন্দর্য। মর্দন সম্পন্ন হলে মিশ্রণের রং ধবধবে সাদা দেখায়। এরপর শুরু হয় অাসল কাজ অর্থাৎ বড়ি বসানো। সাধারণত শুকনা পরিস্কার কাপড়, তারের তৈরী বড় জাল বা বাঁশের তৈরী একপ্রকার জাল (যা স্থানীয়ভাবে বড়ি দেয়ার বাড় বা বিত্তি নামে পরিচিত) তার উপরে পরপর অত্যন্ত ধীরে ধীরে সারিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে বড়ি বসানো হয়।

এই সময়ে সাধারণত বাড়ির শিশু-কিশোরী ও বিবাহযোগ্য মেয়েরা এই কাজে হাত লাগায়। সঙ্গে থাকে বয়স্ক, অভিজ্ঞ, মা-চাচী -দাদী ও নানীরা (অনেক সময় নানী বা দাদী সর্ম্পকীয় আত্মীয়দেরকে এই বিশেষ কাজের জন্য দাওয়াত করে আনা হয় এবং বড়ি দেয়া শেষে তাদেরকে নতুন কাপড় দিয়ে বিদেয় করা হয়)। ছোট মেয়েরা যে বড়ি বসায় তার নাক যেমন হবে, তার উপর নির্ভর করে তার স্বামী হবে, এমনটা মনে করা হয় এবং যে মেয়ে, যত সুন্দর এবং নাক খাড়া করে বড়ি বসাতে সক্ষম হয় পরবর্তিতে সে তত ভাল সু-গৃহিনী এবং ভাল স্বামী পাবে বলে মনে করা হয়। একারণে বড়ি দেয়ার এই সময়টি বাড়ির অবিবাহিতা,বিবাহযোগ্যা বা শিশু-কিশোরীদের জন্য একটি বিরাট পরীক্ষাক্ষেত্রও বটে।

বড়ি তৈরী শেষে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। এবং ওই বড়ি যেন পাখি, কাঠবিড়ালী বা অন্য কোন কিছুতে নস্ট না করে দেয় এজন্য সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যাবস্থা করা হয়। এই কাজে ব্যবহার করা হয় বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে। এজন্য বাচ্চাদের স্কুল ছুটির সময়টাকেই বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিকেই বড়ি দেবার দিন হিসাবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। দিনের বেলা রোদে রেখে রাতে কুয়াশা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ওই বড়ি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয় এবং পরের দিন রোদ উঠলে আবার কাপড় তুলে রোদ লাগালো হয় । সাধারণত ২-৩ দিন কড়া রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত সম্পন্ন হয় সুস্বাদু কুমড়া-বড়ি । এরপর এই বড়ি যে কোন মুখবদ্ধ কৌটায় বা এলুমিনিয়ামের হাড়িতে কাপড় দিয়ে ঢেকে সংরক্ষণ করা হয় । প্রায় প্রতিমাসে এক বা একাধিক বার এই বড়ি বের করে কিছু সময়ের জন্য আবার রোদে দেয়া হয়। তাহলে বড়িতে ছাতা ধরে না। তা না হলে বহু পরিশ্রমের এই ফল খাবার অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। বড়ি ঠিকমত না শুকালে তা তোলা সম্ভব হয় না এবং তা ঘরে রাখলে বেশিদিন থাকেও না, গন্ধ হয়ে যায়, ছাতা ধরে যায় এবং এর স্বাদ ও ভাল হয় না ।

অনেক সময় আবহাওয়ার বিরুপতার কারণে অর্থাৎ ঘন কুয়াশা, ঠিকমত রোদ না উঠা এবং বৃষ্টিজনিত কারণে এত পরিশমের ফল সম্পূর্ণ বিস্বাদ এবং খাবার অনুপযোগী হয়ে যায়। এখানেও রয়েছে ভাগ্যের মার প্যাঁচ। কারও বড়ি দেয়ার দিন বা পরে মেঘ হলে বা রোদের স্বল্পতা দেখা দিলে সেই নারীকে অপয়া মনে করা হয় । এ কারনেই এত্তসব কাজ করার আগে আকাশের দিকে নজর রাখতে হয় এবং সেইসাথে চাঁদের হিসাব জানাও জরুরী। কারণ অমাবশ্যার সময়ে সাধারণত মেঘ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অমাবশ্যা আর পূর্ণিমার এই হিসাব সাধারণত মেয়েরাই রাখে । এসব কারণে এই কস্টসাধ্য ও পরম্পরাগত কাজে নারীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

আমরা গর্বিত আমাদের এই পরম্পরার জন্য। আমরা গর্বিত আমাদের এই সকল প্রেমময়ী মা-চাচী-বোন-নানী-দাদীদের জন্য। যাদের অসম্ভব কর্মস্পৃহা আজও আমাদের এই অসম্ভব প্রিয় আর সুস্বাদু খাবারটির স্বাদ গ্রহণের সুযোগ করে দিচ্ছে বারবার।

বেঁচে থাক আমাদের মা-বোন-চাচী-খালা-নানী-দাদী-বৌ-ঝিরা। বেঁচে থাক আমাদের ঐতিহ্য আর পরম্পরা।

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes