মেহেরপুরের পেয়ারা এবং এর বিস্ময়কর উপকারীতা

বাংলার আপেল খ্যাত পেয়ারা এখন মেহেরপুর জেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হওয়া এ পেয়ারাটি থাই জাতের। কৃষকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে থাই পেয়ারা চাষ। মেহেরপুরের অনেকে থাই পেয়ারা চাষ করে এখন লাখপতি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে থাই পেয়ারার বাগান। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার বাগানগুলোতে ফল এসেছে ভালো। এ বছর অর্ধ কোটি টাকার পেয়ারা বিক্রি করার আশা করছেন চাষীরা। অর্থকরী ফল এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর থাই পেয়ারার চাহিদা থাকায় এ পেয়ারার আবাদ দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। মুজিবনগর সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাণ্যিজিক ভিত্তিতে থাই জাতের পেয়ারার বাগান করেছে মেহেরপুর সদরের চাষীরা। চাহিদা থাকায় বিঘা প্রতি এক লক্ষ থেকে এক লক্ষ বিশ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রির আশা তাদের। এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারার আবাদ করতে উৎপাদন খরচ হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। মাত্র বছর সাতেক আগে মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের মাঠে পরীক্ষামূলক থাই পেয়ারার আবাদ শুরু করে পিরোজপুর গ্রামের ইসাহক আলী। এ পেয়ারার পুষ্টিগুণ ও সুস্বাদু তার কারণে এবং মেহেরপুরের মাটিতে ভালো ফলন হওয়ায় লাভবান হয় ওই পেয়ারা চাষীরা । ব্যাপক লাভজনক হওয়ার কারণে জেলায় চলতি বছর কৃষি বিভাগের হিসেবে ১৫০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে এ থাই পেয়ারার আবাদ হয়েছে। আগামী বছর পেয়ারার আবাদ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে কৃষি বিভাগ মনে করছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, সিলেট, চিটাগাং ও অন্য জেলায় এখন মেহেরপুরের থাই পেয়ারা বাজারজাত হচ্ছে। পেয়ারা চাষী ইসাহক আলী তার ২০ বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা থেকে ২০ লাখ টাকার বেচাকেনা হবে বলে আশা করছেন। তিনি জানান, প্রতিবিঘা পেয়ারা চাষে প্রথম বছর ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। পরবর্তি বছরগুলোতে পরিচর্যা, আর জৈবসার বাবদ বছরে ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তবে এ পেয়ারা একটু বড় হওয়ার পর পলিথিন দিয়ে বেঁধে না দিলে পোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায়। এ আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারলেই পেয়ারা চাষে সফলতা এবং অর্থ পাওয়া যাবে। একই গ্রামের পেয়ারা চাষী বাদল হোসেন জানান, গ্রামের ইসাহকের দেখাদেখি পেয়ারা চাষ করছে অনেক কৃষক। তিনিও দু‘বছর ধরে দেড়বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তবে স্থানীয় বাজারেও এ পেয়ারার দাম ভাল পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ঢাকা, সিলেট, চিটাগাং জেলায় বাজারজাত করতে হয় এই পেয়ারা। ওইসব এলাকার বড় বড় ক্রেতারা এসে পেয়ারা কিনে নিয়ে যায়। পেয়ারা বাগানের ভেতর সমন্বিতভাবে অন্য ফসল আবাদ করাই বেশি লাভবান হচ্ছেন চাষী। চাষীরা বলছেন- প্রথম বছরে পেয়ারা চাষের সঙ্গে পিয়াজ ও লালশাক আবাদ করেছে এবং খরচের টাকা তারা তুলে নিয়েছে। বিষমুক্ত পদ্ধতি অবলম্বনে মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ

জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মেহেরপুর জেলায় ১৫০ বিঘা জমিতে থাই পেয়ারার আবাদ আছে। এ বছর ফলন ভালো ও ব্যাপক চাহিদার কারণে অন্তত এক কোটি টাকার থাই পেয়ারার বেচাকেনা হবে। বাজারে প্রতি কেজি থাই পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে  ১০০ টাকা কেজি দরে ।

পেয়ারা অনেক সাধারণ একটি ফল তাই অনেকে এটিকে অবহেলা করে থাকেন। কিন্তু এর মধ্যে থাকা পুষ্টি উপাদান ও গুণাবলী গুলো জানলে পেয়ারাকে যে আর কখনোই উপেক্ষা করবেন না এটা নিশ্চিত রূপে বলতে পারি। পেয়ারা একটি ভিটামিন-সি আর ময়েশ্চারসমৃদ্ধ ফল। এর উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ও ‘সি’ ত্বক, চুল ও চোখের পুষ্টি জোগায়, ঠান্ডাজনিত অসুখ দূর করে।




পেয়ারার স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো নিচে তুলে ধরা হল:

১। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ:
পেয়ারায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে এবং এটি কোষকে রক্ষা করে ও তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে করতে সাহায্য করে।

২। ডায়াবেটিকের ঝুঁকি হতে রক্ষা করে:
এর ফাইবার ব্লাড সুগার কমাতে সাহায্য করে। এবং শরীরের ডিজেস্টিভ সিস্টেমকেও ভালো রাখে। পেয়ারা শরীরের অতিরিক্ত শর্করা শুষে নিতে পারে ৷ এছাড়াও এতে যে ফাইবার রয়েছে তা বেশ উপকারি৷ এই বিশেষ ফলটি টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম৷

৩। চোখের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে:
ভিটামিন এ দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি করতে চমৎকার কাজ করে। পেয়ারা Retinol সমৃদ্ধ ফল। তাই আপনি যদি গাঁজর খেতে অপছন্দ করেন তাহলে আপনার দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি করতে পেয়ারা খেতে পারেন।

৪। রক্তচাপ কমায়:
পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে৷ এটি শরীরের অতিরিক্ত রক্তপাচ কমাতে সাহায্য করে ও রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখে৷

৫। ট্রেস উপাদান কপার সমৃদ্ধ :
থাইরয়েড গ্রন্থি কার্যকরী বজায় রাখতে পেয়ারা খুব ভাল উপাদান, এতে ট্রেস উপাদান তামা থাকে। এটি থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাস্থ্য সমস্যা দূর করে।

৬। ম্যাঙ্গানিজের ঐশ্বর্য:
পেয়ারা আমরা আমাদের খাদ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি শোষণ করে শরীরের সকল খাবারের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। এটি ম্যাঙ্গানিজ সমৃদ্ধ । এটি পুষ্টির ভাণ্ডার।

৭। স্নায়বিক আরাম:
পেয়ারা একটি ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ ফল। এটা শরীরের পেশী এবং স্নায়ু শিথিল করতে সাহায্য করে। সুতরাং একটি কঠিন কাজ করার পরে, একটি পেয়ারা আপনি আপনার পেশী শিথিল এবং আপনার কর্ম সিস্টেমে একটি চমৎকার শক্তির সাহায্য দিতে সাহায্য করবে।

৮। রক্ত পরিষ্কার করে:
পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন সি ও লাইকোপিন রয়েছে৷ এর ফলে রক্ত পরিষ্কার হয় ও ত্বক অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়৷ এছাড়াও লাইকোপিনের সাহায্যে গালে গোলাপী আভা ফুটে ওঠে৷

৯। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধ করে:
পেয়ারায় অবস্থিত ভিটামিন সি বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে৷ এছাড়াও এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম৷

১০। পাকস্থলীর স্বাস্থ্য ভালো রাখে:
যেকোন ব্যকটেরিয়া সংক্রমণ বা পেটের গোলযোগে সবচেয়ে কার্যকরী হল পেয়ারা৷ এই ফলটিতে অ্যাস্ট্রিজেন্ট ও অ্যান্টি-মাইক্রোবাল উপাদান থাকে ফলে এটি পাকস্থলীর স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে৷

১১। ওজন কমায়:
যাদের ওজন অতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তারা পেয়ারা খেতে পারেন৷ পেয়ারা খেলে শরীরের অতিরিক্ত ওজন খুব সহজেই ঝড়ানো যেতে পারে৷

১২। ত্বক সুস্থু রাখে
ত্বককে ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে রক্ষা করে। ত্বক, চুল ও দাঁতের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। পুষ্টির বিচারে পেয়ারা হোক সবার নিত্যসঙ্গী।

১৩। চুল ভালো রাখে:
পেয়ারায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ যা চুলের স্বাস্থ্য রক্ষা করে ও চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পেয়ারা নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে।

১৪। রোগ প্রতিরোধ বৃদ্ধি করে:
পেয়ারায় রয়েছে ক্যারটিনয়েড, পলিফেনল, লিউকোসায়ানিডিন ও অ্যামরিটোসাইড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ক্ষতস্থান শুকানোর জন্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes