চোখের আলো হারানো মেহেরপুরের মামুন কম্পিউটার প্রশিক্ষক



জন্মের পর থেকে আর দশটা ছেলের মতো জীবনযাপন করত মামুন। সবার মতো সেও স্কুলে যেত, খেলাধুলা করত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। এরপর চোখে কম দেখতে শুরু করেন তিনি। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন মামুন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও থেমে থাকেননি। শ্রুতিলেখকের মাধ্যমে চালিয়ে যান পড়ালেখা। প্রতিবন্ধিতা কোনো বাধা নয়, এ কথার প্রমাণ রেখে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মেহেরপুরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী যুবক মামুন। অদম্য মেধাবী মামুন তরুণ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে এখন কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জগতকে জয় করে হাতের মুঠোয় নিতে সক্ষম হয়েছেন।

দৃষ্টিশক্তিহীন ওমর ফারুক মামুন এখন মেহেরপুর সরকারি সমাজসেবা অফিসের কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। যা সবাইকে অবাক করার মতো। মেহেরপুরের শিবপুর গ্রামের মামুন যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র তখন চোখে রোগ দেখা দেয়। বেশি পড়লে তীব্র যন্ত্রনা হতো মাথায়। এসএসসি পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা মামুনের দু’চোখে গ্লুকোমা রোগ সনাক্ত করেন। কিন্তু অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা জোটেনি। বিএসসি পরীক্ষার সময় চাপ বাড়ে পড়াশোনার। রাত জেগে পড়তে হয়। ২০০৬ সালে পরীক্ষার আগে একদিন মামুনের দু’চোখ দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়ে। জীবন যুদ্ধে থেমে যায়নি মামুন। শ্রুতিলেখক দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে সেই পরীক্ষায় ভালো ফলও অর্জন করেন তিনি। ইচ্ছা ছিল বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি নিয়ে বড় আমলা হবেন। কিন্তু দৃষ্টিশক্তিহীন হওয়ায় বেছে নেন কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জগতকে। বিশেষ সফটওয়্যার ও অ্যাপসের মাধ্যমে শব্দ শুনে শুনে তিনি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জগতে এখন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মামুন এই বছরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি কম্পিউটার প্রশিক্ষক ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে মালয়েশিয়াতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট বিষয়ক ১৫ দিনের সেমিনারে অংশ নেন।


মামুন এখন এলাকাবাসীর গর্বিত সন্তান। তিনি গ্রামে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে ঘরে ঘরে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে চান।

সমাজসেবা কার‌্যালয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা যখন প্রথম কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে আসি তখন মামুন স্যারকে দেখে অবাক হই। কারণ তিনি চোখে দেখেন না কিন্তু কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেবেন। পরে তার ক্লাস নেওয়া দেখে আমরা মুগ্ধ।

মামুন স্যার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি হয়েও অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। আমাদের সবকিছু থাকতেও আমরা কেন পারব না।

মামুনের ছোট বোন ইভা আক্তার বলেন, ভাইকে দেখে আমাদের গর্ব হয়। বাড়িতে ভাইকে আমরা সব সময় সাহায্য করে থাকি। মামুন ভাই যদি সরকারি ভালো একটি চাকরি পেত তাহলে আমরা অনেক খুশি হতাম।





মামুনের মা খাদিজা খাতুন বলেন, ছেলের এ সফলতা দেখে আমি অনেক আনন্দিত। অন্যন্যা ছেলেরা যা পারেনি আমার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে তা করে দেখিয়েছে। সমাজে অন্য ছেলেদের মতো অবহেলিত অবস্থায় থাকতে হয়নি মামুনকে। সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রধান প্রশিক্ষক এস এম রাসেল আহম্মেদ বলেন, মামুন যখন প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসে তখন আমরা তাকে নিতে চাইনি। পরে তার দক্ষতা ও কম্পিউটারের উপরে অভিজ্ঞতা দেখে আমরা তাকে নিয়োগ দিই। তার মতো সহকর্মী পেয়ে আমি অনেক খুশি

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes