মেহেরপুরের দুটি বধ্যভূমি আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি


স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঐতিহাসিক মেহেরপুর জেলা ভারতের সীমান্ত এলাকা হওয়ায় মুজিবনগর খ্যাত এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। এই মেহেরপুরের তৎকালীন জেলা কুষ্টিয়া পাক-হানাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে এ অঞ্চলের আনসার মুজাহিদ মুক্তিযোদ্ধারা কুষ্টিয়া পুনর্দখলে নেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করলেও ৪৭ বছরেও তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরুণ হয়নি।স্বাধীনতার এই মাসে মেহেরপুরের দুটি বধ্যভূমির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চায় মুক্তিযোদ্ধারা।
৭ মার্চ ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর মেহেরপুরের মুক্তিকামী মানুষ পাকসেনাদের এ দেশ থেকে তাড়ানোর জন্য আন্দোলন শুরু করে। ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এ মেহেরপুর দখলে নেয়ার জন্য পাক সেনারা ২৫ মার্চ মেহেরপুরের সাবেক জেলা কুষ্টিয়া আক্রমণ করে। এ কথা মেহেরপুরে ছড়িয়ে পড়লে মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক তৌওফিক-ইলাহী এ অঞ্চলের আনসার-মুজাহিদদের একত্রিত করে কুষ্টিয়া সম্মুখ যুদ্ধের জন্য আহ্বান করেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে মেহেরপুরের ১৫৬ জন আনসার মুজাহিদ কুষ্টিয়ায় যায়। ২৯ মার্চ রাতে মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, ক্যাপ্টেন ইয়ার আজম চৌধুরীর নেতৃত্বে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল, পুলিশ লাইন ও ওর্য়ালেস এলাকায় আক্রমণ চালায়। সেখানে অনেক হতাহতের পর কুষ্টিয়া পুনর্দখল হয়  ১৪৭ বালুস রেজিমেন্টের মেজর সয়েবসহ ১৫০ জন পাক সেনা নিহত হয়। এরপর এই মেহেরপুরে পাকসেনাদের বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাকসেনারা ১৮ এপ্রিল মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপিতে আক্রমণ চালিয়ে ব্যানেট দিয়ে খুঁচিয়ে ২৭জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা ডিপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান বাচ্ছু বলেন, হত্যাকাণ্ডে যেসব এ দেশীয় রাজাকার সহযোগিতা করেছিল, তাদের বিচার করতে হবে। সেই সাথে আমঝুপিতে নিহত ২৭ জন শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করার দাবি করেন। এদিকে পাকসেনারা মেহেরপুর সরকারি কলেজের পিছনের আমবাগান ও সদর উপজেলার কালাচাঁদপুর মাঠে নির্যাতন সেল তৈরি করে। এখানে মেহেরপুরের বিভিন্ন পেশার মানুষকে ধরে এনে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করতো। এ ভাবে তারা ৫/৬ হাজার মানুষকে হত্যা করে। এই দুটি স্থান বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বশির আহমেদ বলেন, এ জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি এ ২টি বধ্যভূমি স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও সংস্কার কিংবা এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হয়নি। তাদের প্রত্যাশা এদুটি স্থানে বধ্যভূমির স্বীকৃতি দেয়া হক। মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনা অনুসারে এ দুটি স্থানে সে সময় এক হাঁটু পরিমাণ রক্তের স্তূপ ছিল। সে স্মৃতি মুক্তিযোদ্ধারা আজ ও ভুলতে পারে না। এই দুটি স্থান থেকে নর কঙ্কালদের কিছু হাড়-গোড় তুলে এনে মেহেরপুর পৌর গোরস্থানের পাশে সেগুলো মাটি দিয়ে গণকবর-এর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। যা মুক্তিযোদ্ধাদের চাহিদা পূরুণ করতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৭ এপ্রিল এ মেহেরপুরের মুজিবনগর আম্রকাননে তখন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী মন্ত্রীপরিষদ শপথ গ্রহণ করেন। মুজিবনগরকে ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী। তার পর থেকে মেহেরপুরে সব বয়সের মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতের নদীয়া জেলার তেহট্রো থানার বেতায় লালবাজার মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে গিয়ে ট্রেনিং গ্রহণ করে এবং উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতের বিহার প্রদেশের চাকুলিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগদান করেন। তারা ৯ মাস যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন করে। দেশ স্বাধীন করে তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা আজো পূরুণ হয়নি। এই স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান দাবি মেহেরপুরের ভয়ঙ্কর সেই বধ্যভূমি দুটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

https://www.facebook.com/MeherpurDistrictBD/videos/1403400593080331/


Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes