মেহেরপুরের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বসেরা ছাগলের জাত

ব্ল্যাক বেঙ্গল হল ছাগলের একটি জাত যা বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতেরওড়িশা অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই ছাগলের দেহের বর্ণ মূলত কালো, তবে বাদামী, ধুসর ও সাদা রঙের ছাগলও দেখা যায়। ব্ল্যাক বেঙ্গল আকারে ছোট কিন্তু দেহের কাঠামো আঁট এবং পশম খাটো ও নরম। এ জাতের ছাগলের শিং ছোট ও পা খাটো। এদের পিঠ সমতল। কানের আকার ১১-১৪ সেমি এবং সামনের দিকে সুচালো। একটি পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ ছাগলের ওজন হয় ২৫ থেকে ৩০ কেজি, মাদী ছাগলের ২০ থেকে ২৫ কেজি। পূর্ণবয়স্ক ছাগলের উচ্চতা ৫০ সেমি হয়ে থাকে। উভয় লিঙ্গের ছাগলেই দাঁড়ি দেখা যায়। দুধ উৎপাদন ক্ষমতা কম হলেও কম পরিমাণের খাদ্য চাহিদা এবং বেশি পরিমাণে বাচ্চা উৎপাদনের কারণে বাংলাদেশে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের বেশ চাহিদা রয়েছে। খুব দ্রুত প্রজননক্ষম হয় বলে এই জাতের মাদী ছাগল বছরে দুই বার গর্ভধারন করতে পারে এবং প্রতিবারে ৩ থেকে ৪টি বাচ্চা প্রসব করে। কম সময়ে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে বলে এই জাতের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। উচ্চ মানের মাংস ও চামড়ার জন্য এই জাত প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশে বেকারত্ব ও দারিদ্র দূরীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের ক্ষেত্রে ব্যাল্ক বেঙ্গল ছাগলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

নীরবে-নিভৃতে মেহেরপুরে প্রায় প্রতিটি ঘরে পালন করা হচ্ছে ছাগল। ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের এই ছাগল বিশ্বসেরা এবং বেশ অর্থকরী। বর্তমানে জেলায় প্রায় এক লাখ পরিবারে প্রায় দুই লাখ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন হচ্ছে।  মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, তাদের হিসাব মতে মেহেরপুরে এক লাখ ৬ হাজার পরিবারে এক লাখ ৭৮ হাজার ৫৮৮টি ছাগল পালন হচ্ছে। যার প্রায়   সবগুলোই ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট।

মেহেরপুরে শহর ও গ্রামে বিপুল সংখ্যক ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল দেখা যায়। এমন বাড়ি কমই দেখা যায়, যে বাড়িতে ছাগল নেই। ছাগল পালনকারীরা নিজেরাও জানেন না যে, তারা যে ছাগল পালন করছেন তা বিশ্বের প্রথম শ্রেণির ছাগল এবং এর মাংস অন্যান্য ছাগলের মাংসের চেয়ে পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এর চামড়া বিশ্বমানের ও কুষ্টিয়া গ্রেড হিসেবে পরিচিত।

এ অঞ্চলের ছাগলের চাহিদা রয়েছে সারা দেশে। প্রতি সপ্তাহে মেহেরপুর জেলার হাটগুলো থেকে এই ছাগল সরাদেশেই যায়।



বিভিন্ন সংস্থা ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ছাগল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪র্থ স্থান দখল করে রেখেছে। আর এদেশে পালিত ছাগলের ৯৫ ভাগই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কয়েকটি জেলায় এ ছাগল পালন বেশি হয়। মেহেরপুর জেলার প্রায় প্রতিটি ঘরে দুইটি থেকে পাঁচটি ছাগল রয়েছে। কোন কোন বাড়িতে এর বেশিও রয়েছে।

আশির দশকে বি.আর.ডি.বি’র সহযোগিতায় মেহেরপুরে উন্নত ছাগলের সংকরজাত আনার জন্য জাপানিরা শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় ছাগলের একটি খামার করেন। কিন্তু এ জেলার মানুষ সংকরজাত ছাগলের ব্যাপারে আগ্রহী না হওয়ায় তা অল্প দিনেই মুখ থুবড়ে পড়ে। সেখানে খামারের অস্তিত্ব থাকলেও নেই দেশি-বিদেশি কোন ছাগল।

মেহেরপুর সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের শোলমারী গ্রামের বাঙালপাড়ার গৃহবধূ বিলকিস তার বাড়িতে ছাগল পালছেন। দুইটি ছাগল থেকে তার পালে ৬২টি ছাগল হয়েছিল। তিনি গত ঈদুল আজহায় বেশ কয়েকটি ছাগল বিক্রি করে লাভবান হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে ছাগল বিক্রি করে টাকা জমিয়ে তিনি জমি কিনে পাঁকা বাড়ি করেছেন। বর্তমানে তার পালে অনেকগুলো ছাগল রয়েছে।

এদিকে সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করতে গ্রামের বধূরা দুই চারটি করে ছাগল পালন করে থাকেন। মেহেরপুরের গ্রামে অনেক পরিবার রয়েছে যেখানে ৮টি থেকে ১৫টি বা তার বেশি ছাগলও রয়েছে।

মেহেরপুর শহরের বাসস্ট্যান্ড কাজি অফিসপাড়ার তৌহিদা খাতুনের রয়েছে ৯টি ছাগল। এর মধ্যে একটি ছাগল বছরে দুই বার কমপক্ষে ৪টি করে ৮টি বাচ্চা দেয়। এর আগেও কয়েকবার ওই ছাগল ৫টি করে বাচ্চা দিয়েছে বলে তিনি জানান। ৩ মাসের বাচ্চা প্রতিটি ৩ হাজার টাকা করে বিক্রি হয়। এভাবে তিনি সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করে চলেছেন।



একই পাড়ায় মমে বেওয়া ৪ ছেলের কারো সংসারে না থেকে নিজের সংসার নিজেই চালান। তার রয়েছে ৭টি ছাগল। তিনি জানান, পালের ছাগল বিক্রি করে তিনি খেয়ে-পরে ভালই আছেন। মাঝে মাঝে তিনি তার নাতি-পুতিদেরও কাগজ-কলম কেনার টাকা দেন।

তৌহিদা খাতুন ও মমে বেওয়া আরো জানান, শহরে বাস করলেও ছাগল পালন করতে ঘাস বা পাতা তেমন কিনতে হয় না। নিজেদের বাড়ির ও প্রতিবেশিদের বাড়ির ভাতের ফ্যান-পানিই যথেষ্ঠ। এছাড়া ছাগল চরে খায়। মাঝে মাঝে যখন কিছুই পাওয়া যায় না তখন অল্প কিছু ঘাস-পাতা কিনলেই চলে যায়।

মেহেরপুর সদর উপজেলার শোলমারী গ্রামের বাঙালপাড়ার গৃহবধূ বিলকিসসহ গ্রাম অঞ্চলের অনেক গৃহবধূ, স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা নারী জানান, তারা ছাগল পোষেন। এর জন্য খাবার কিনতে হয় না। তারা মাঠঘাটে ছাগল চরিয়ে খাওয়ান। তবে ছাগলের চিকিৎসার জন্য তারা পশু হাসপাতাল বা গ্রামের পশু চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হন।বাকবেঙ্গল ছাগল মেহেরপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পশুসম্পদ।

‘গরিবের গাভী’ খ্যাত মেহেরপুরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম উৎস এ ব্লাকবেঙ্গল। দ্রুত প্রজননশীলতা, উন্নত মাংস, মাংসের ঘণত্ব ও চামড়ার জন্য ব্লাকবেঙ্গল ছাগল বিশ্ববিখ্যাত। বেকার সমস্যা দূরীকরণ, দারিদ্র বিমোচন, পুষ্টি সরবরাহবৃদ্ধি এবং বৈদেশিকমুদ্রা অর্জনে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে ছাগল।


প্রায় ১১ হাজার বছর পূর্বে বর্তমান ইরানের আশিকোশ পর্বত মালায় খাদ্যাভাব দেখা দিলে যাযাবররা ছাগল নিয়ে পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দুটি পথে যাযাবররা ছাগল নিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে মেহেরপুর অঞ্চলে যে ছাগল দেখা যায় তা সম্ভবত দক্ষিণ চীন, হুনাইন দ্বীপ ও তাইওয়ানের পশ্চিমাঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী অথবা যাযাবরদের মাধ্যমে তিব্বতের মালভূমি হয়ে এসেছে। এ ছাগল বিজোয়ার ছাগলের বংশধর বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মাংস, দুধ এবং চামড়া উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে ব্লাকবেঙ্গল।

মেহেরপুরের পাশের জেলা চুয়াডাঙ্গা এ ব্লাকবেঙ্গলকে জেলার ব্রান্ডিং করেছে। ৮০র দশকে জাপানের জাইকা বিএডিসির মাধ্যমে মেহেরপুরে ছাগল খামার গড়ে তোলে। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাঠা ছাগলের মাধ্যমে ক্রস করার ফলে বর্তমানে ব্লাকবেঙ্গল হারিয়ে যাবার পথে। ব্লাকবেঙ্গলকে ফিরিয়ে আনতে সামাজিক সংগঠন ‘ওয়েভ ফাউন্ডেশন’ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনের মাধ্যমে আয়-বৃদ্ধিকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ দেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ভ্যালুচেইন উন্নয়ন প্রকল্প ইফাদ এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন এর সহযোগিতায় মেহেরপুর জেলায় ৬ হাজার পরিবারকে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী করেছে। জেলার ৬ হাজার পরিবারে ব্লাক বেঙ্গল এনে দিয়েছে সমৃদ্ধি।

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes