কালবৈশাখী এবং বিদেশী ক্রেতার অভাবে সমস্যায় মেহেরপুরের আম চাষীরা

এবছর  মেহেরপুর জেলার আম বাগানের আমগাছগুলো মুকুলে মুকুলে ভরে গিয়েছিল ।  গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড মুকুল হয়েছিলেএবার ।  মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠেছিল আম বাগানগুলো । বাড়ির আঁনাচে কাঁনাচে যেখানেই আম গাছ সেখানেই আম এর মুকুলে ভরে গিয়েছিল। সেই সাথে মেহেরপুর জেলার প্রায় ১১ হাজার আমচাষীর ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছিল । বাগানের মালিকেরা আমগাছে ওষুধ হরমোন কিটনাশক দিয়ে স্বপ্ন দেখতে  শুরু করে দিয়েছিল আমের বাম্পার ফলনের চলছিল  বিভিন্ন ধরণের যত্ন-আত্মির ।

নিচের ছবিগুলোতে দেখুন আমের মুকলের সেই মন হরণ করা  ছবি ।





কিন্তু এর পরই আসে বিপর্যয় । একর পর এক কালবৈশাখী ঝড়  আছড়ে পড়তে থাকে মেহেরপুর বিভিন্ন গ্রামে । সেই সাচক আসে শিলাবৃষ্টি । এই ধরণের আবহাওয়ার সাথে মেহেরপুরের মানুষ খুব একটা  অভ্যস্ত নয় । মেহেরপুরের অতীত  সাম্প্রতিক ইতিহাসে এধরণের বার বার কালেবৈশাখীর আঘাতের কথা শুনা যায় না । বার বার প্রলয়ংকরী এই সকল ঝরের কারণে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি আমের উৎপাদন ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।

মেহেরপুরে বিভিন্ন গ্রামে বারবার  কালবৈশাখী ঝড় হানা দিয়েছে। মেহেরপুর সদর উপজেলার রাজনগরে কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে তান্ডবে গ্রামের মসজিদসহ ৭৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া  ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। খবর পেয়ে মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের নির্দেশে একটি টিম রাজনগর গ্রাম পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অবগতি করেছেন। এ সময় সেখানে ছিলেন  রাজনগর ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য  আরমান আলী, ইউপি সচিব এরশাদ আলী । গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দান করেন মেহেরপুর জেলা প্রশাসক। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত কয়েকদিন থেকেই দেশের কোথাও কোথাও দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হচ্ছে। তবে  বৃহস্পতিবার থেকে তা বেড়েছে। কালবৈশাখীর সঙ্গে শিলা ঝরেছে  ।   গতকাল রাতেও বিভিন্ন স্থানে  কালবৈশাখী আঘাত হেনেছে মেহেরপুরে।





কৃষি বিভাগ জানায়, আমচাষে প্রথমে আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর কথা। এ দু’জেলায় আম উৎপাদন হয় বেশি। কারণ এই দুই জেলাই আয়তনে মেহেরপুরের চেয়ে অনেক বড়।  কিন্তু স্বাদের দিক থেকে মেহেরপুরের আম এক নাম্বার। আম সুস্বাদু হওয়ায় মেহেরপুরের আমের চাহিদা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপেও  দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমের বাগানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেহেরপুরের মুজিবনগর বৃটিশ শাসনামলে তৈরী মুজিবনগর আম্রকাননে ১২শ’ আমগাছ আছে। ওই বাগানে ১২শ’ আমগাছ ১২শ’ জাতের।




মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মালসাদহ গ্রামের আমবাগান ক্রেতা আজমাইন হোসেন জানান- মুকুল আসার আগেই তিনি প্রতিটি আমবাগান এক থেকে তিন বছরের জন্য কিনে নেন। তার ১২টি বাগান কেনা আছে। এবার  প্রতিটি বাগানেই বাম্পার মুকুল  এসেছিল কিন্তু  বার বার ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে  ৮০ ভাগ আম ঝরে পড়েছে  ।



মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এসএম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মূলত তিনটি পর্যায়ে আমের মুকুল আসে।জেলায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। আমচাষের জেলা রাজশাহী হলেও সুস্বাদু আমের জেলা মেহেরপুর। এখানকার মাটির গুণেই হিমসাগর, লেংড়া, বোম্বাই, তিলি বোম্বাই ইত্যাদি জাতের আম খুবই সুস্বাদু। বিশেষ করে নিয়মিত জাত ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি, আশ্বিনা জাতের বাগান বেশি থাকলেও গবেষণাকৃত বারি-৩, বারি-৪ জাতের বাগান তৈরির ক্ষেত্রেও আগ্রহী হয়ে উঠছে অনেকে। সেই সঙ্গে নতুন নতুন বাগানগুলো তৈরী হচ্ছে বনেদি ও হাইব্রিট জাতের। নিয়মিত যত্ন নিলে আমের অফ ইয়ার বলে কিছু থাকে না। প্রতিবছরই বাগানে আম আসবে বলে তিনি জানান। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়  এবছর খুবই বেশি ।

এরই সাথে মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মত আম বিদেশে রপ্তানিতে ধাক্কা খেল মেহেরপুরের আম চাষিরা। চাষিদের সাথে মৌখিক চুক্তি অনুযায়ী আম কিনতে গড়িমসি করছেন রপ্তানিকারকরা। ফলে বিদেশে রপ্তানির জন্য ব্যাগিং করা আম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বেশ কিছু আম চাষি। ২০০ টন আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গেল বছর লক্ষমাত্রা পূরণ হয়নি ।  রপ্তানিকারকরা আম কিনেছেন লক্ষমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এরপর থেকে আর দেখা মিলছে না তাদের। সদুত্তর দিতে পারছে না কৃষি বিভাগও। লোকসানের পাল্লা ভারি হচ্ছে কৃষকদের। তবে রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন  আমের মান যাচাইয়ের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আম তারা কিনবেন কিনা।

বার বার ঝড়  ও শিলাবৃষ্টির  আঘাতের  পর আমের বর্তমান দৃশ্য
গত বছরের অগের বার অর্থাৎ ২০১৬ সালে ব্যাগিং করে রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আমের ভালো দাম পাওয়ায় গত বছরও আম রপ্তানিতে উত্সাহিত হয়েছিল  মেহেরপুরের আম চাষিরা কিন্তু ধরা খাওয়ায় এবছর ও এখন পর্যন্ত আমদানীকারকদের গড়িমসরি কারণে চাষীর হতাশ।   কৃষি বিভাগ ও রপ্তানিকারকদের নির্দেশনা মোতাবেক গত বছর ৯ লাখ আম ব্যাগিং করেন তারা। রপ্তানির জন্য ২৫ মে আম সংগ্রহ করার কথা ছিল তাদের। কিন্তু সেই আম সংগ্রহ শুরু করে ৩১ মে থেকে। দাম দেওয়া হয় কেজি প্রতি ৮৫ টাকা। অথচ ২০১৬ সালে দাম  ছিল ৯৫ টাকা। এতে হতাশ হন আম চাষিরা। কারণ প্রতি কেজি আম রপ্তানিযোগ্য করে তুলতে খরচ হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। তারপরও রপ্তানিকারকরা আম নেওয়ার সময় ব্যাগিং করা আমের ৪০ ভাগ বাদ দিচ্ছেন। এতে ক্ষোভ বাড়তে থাকে কৃষকদের মাঝে। আম চাষিরা ভুগছেন চরম হতাশায়। বাড়তি খরচ করে ব্যাগিং করা আম তারা কোথায় বিক্রি করবেন তা নিয়ে চিন্তিত চাষিরা। কারণ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে গেলে উৎপাদন খরচই উঠবে না বলে জানান চাষীরা।


আম চাষি সাইদুর রহমান জানান, ২০০ মেট্রিক টন আমের মধ্যে  গত বছর তিনি নিজেই উৎপাদন করেছিলেন ৫০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে মাত্র ৭ মেট্রিক টন আম তার বাগান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে  তাকে। কারণ প্রতিটি আমে ব্যাগ পরাতে খরচ হয়েছে পাঁচ টাকা করে। দুই লাখ ব্যাগে খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকা। সাথে রয়েছে আনুসঙ্গিক খরচ। একই কথা জানালেন বুড়িপোতা গ্রামের আম চাষি সিরাজুল ইসলাম। তিনি কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী ৫০ লাখ আম ব্যাগিং করেছিলেন । এর মধ্যে মাত্র পাঁচ টন আম তার বাগান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একই অবস্থা আমঝুপি গ্রামের খলিল জর্দ্দার, মামুন, আমদহ গ্রামের আম চাষি হারুন-অর রশিদসহ এক্সপোর্টারদের সাথে চুক্তিবদ্ধ  হন ৭০ জন চাষি। তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য একই।


রপ্তানিকারক আনোয়ার হোসেন এবং রপ্তানিকারক সমিতির উপদেষ্টা মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, রপ্তানির উদ্দেশ্যে ঢাকায় সেন্ট্রাল প্যাক হাউজে আমগুলো নেওয়ার পর ২০ ভাগ বাদ দিচ্ছেন। ফলে রপ্তানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ আগের বছর মেহেরপুর থেকে আম প্যাক করে সরাসরি রপ্তানি করা হয়েছিল। এখন ইউরোপে রপ্তানিকৃত আমের ভালো মূল্য পেলে পরবর্তীতে মেহেরপুরে আম সংগ্রহ করতে আসবেন তারা। অনেককে স্থানীয় বাজারে আম বিক্রি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা।


মেহেরপুর কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এসএম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঢাকায় আমগুলো নিয়ে যাবার পর সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউজে কিছু আম বাদ দেওয়া হচ্ছে। ফলে রপ্তানিকারকদের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes