বিশ্বসেরা মেহেরপুরের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন পদ্ধতি


ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আর মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম। বিশ্ববাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া কুষ্টিয়া গ্রেড হিসেবে পরিচিত
খেতের আলপথ ধরে গবাদিপশু আনা-নেওয়ার এমন দৃশ্য আবহমানকালের। তবে নতুন তথ্য হলো, বাংলাদেশের নিজস্ব জাতের এই ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল হয়েছে বিশ্বসেরা। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার কাদিপুর গ্রামে মাঠ থেকে ছাগল নিয়ে ফিরছেন অঞ্জনা বেগম l ছবি: এহসান উদ্‌দৌলা

খেতের আলপথ ধরে গবাদিপশু আনা-নেওয়ার এমন দৃশ্য আবহমানকালের। তবে নতুন তথ্য হলো, বাংলাদেশের নিজস্ব জাতের এই ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল হয়েছে বিশ্বসেরা।

মেহেরপুর জেলার প্রতিটি গ্রাম প্রতিটি মহল্লায় প্রায়  প্রতিটি বাড়িতে  ছাগল পালতে দেখা যায়। এর প্রায় সবই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল।যদিও ইদানিংকালে অনেকে উন্নত জাতের রাম ছাগল পালনে  ঝুঁকছেন। তবুও ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলই এখনও এ অঞ্চলে  সংখ্যাধিক।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আণবিক গবেষণা কেন্দ্রের (আইএইএ) সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের সেরা ছাগলের  জাত। ১০ বছর ধরে চলা এই গবেষণার ফল অচিরেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে সূত্র জানায়।
সংখ্যার দিক থেকে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। বিশ্ববাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া ‘কুষ্টিয়া গ্রেড’ হিসেবে পরিচিত।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, এই মুহূর্তে আড়াই কোটির বেশি ছাগল আছে বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে। এর ৯৫ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল। দেশের প্রায় এক কোটি লোক ছাগল পালন করে। একক কোনো প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে এটা একটা রেকর্ড। গত পাঁচ বছরেই ৬০ লাখ ছাগল উৎপাদিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষ এ ছাগল পালন করলেও অতি লাভের আশায় অন্য জাতের ছাগলের সঙ্গে এর সংকরায়ণও খুব একটা করে না। ফলে বিশ্বের হাতে গোনা যে চার থেকে পাঁচটি ছাগলের জাতের এখনো সংকরায়ণ হয়নি, স্বতন্ত্র জাত হিসেবে টিকে আছে, তার অন্যতম এই ব্ল্যাক বেঙ্গল। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই জাতটি টিকিয়ে রেখেছে গ্রামের সাধারণ মানুষ।

ছাগল পালনে দারিদ্র জয় অনেক ভাগ্যবঞ্চিত নারীর ।

শুধুই কি মেহেরপুরে  এই ছাগল পালিত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর মিলল পাশের জেলা  চুয়াডাঙ্গা ঝিনাইাদহ  এবং কুষ্টিয়ায় গিয়ে । এই জেলাগুলিতেও প্রায় এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে একটি থেকে পাঁচটি ছাগলের দেখা মিলবে না। বাড়ির উঠান, সড়কের পাশের ফাঁকা জায়গা বা জমির আইল—সব খানে ছাগলের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
চুয়াডাঙ্গা সদরের হাজরাকাঠি গ্রামের সোনা মিঞার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বাড়ির উঠানে এক পাল ছাগলকে ঘাস খাওয়াচ্ছেন তিনি। উঠানে দুটি মাচায় ১৫ থেকে ২০টি ছাগল। সোনা মিঞা জানালেন, এখন তিনি ৪৫টি ছাগলের মালিক। ’৯৬ সালে মাত্র দুটি ছাগল নিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি।
সোনা মিঞার স্ত্রী বেলুহার বেগম সঙ্গে যোগ করেন, এই ছাগল বছরে চারটা করে বাচ্চা দেয়। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এদের ছয় থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। এরা বাড়ির আশপাশের গাছের পাতা, সবজির বর্জ্য খেয়েই বড় হয়। মাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকার ঘাস কিনতে হয়। তাই এদের পালতে বাড়তি কোনো চাপও পড়ে না।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, সারা দেশের ঘরে ঘরে পালিত ছাগলের সংখ্যা দুই কোটি ৫৪ লাখ ৩৩ হাজার। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি ছাগল পালিত হচ্ছে। তবে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলায় বেশি পালিত হয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব এই জাতটির জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং ডিএনএ পরীক্ষা করে দীর্ঘ নয় বছর গবেষণা করেছে জাতিসংঘের আণবিক শক্তিবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থা দুটি বিশ্বের ১০০টি জাতের ছাগলের ওপরে গবেষণা করে ব্ল্যাক বেঙ্গলকে অন্যতম সেরা জাত হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এফএও এবং আইএইএর ওই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্য ৯৯টি জাতের সব ধরনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা করলে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলই সবার সেরা।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে ২০ বছর ধরে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, ‘তুলনা করে দেখা গেছে, অন্যান্য জাতের ছাগলের চেয়ে এর মাংসের স্বাদ ভালো। এ কারণে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা বেশি। এর চামড়া এত উন্নতমানের যে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া ব্যবহৃত হয়।’



ব্ল্যাক বেঙ্গল কেন সেরা: বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রাণিবিদ্যাবিষয়ক স্বীকৃত জার্নালগুলোতে ব্ল্যাক বেঙ্গল নিয়ে শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই গবেষণার মাঝ পর্যায়ে ২০০৭ সালের ২০ মার্চ জাতিসংঘের সংবাদ সংস্থা ইউএন নিউজ-এ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। কিন্তু এখানেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রাণিসম্পদ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের বসতি।’ ওই বছরই আইএইএর ওয়েবসাইটে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলকে বিশ্বসেরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এই ছাগলের নবজাতকের মৃত্যুহার কম। আর এরা বছরে দুবারে কমপক্ষে চারটি বাচ্চা দেয়। তাই অন্য জাতগুলোর তুলনায় এই জাতের ছাগলের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, এটি পালন করতে বড় চারণভূমি লাগে না। বাড়ির উঠান বা রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট স্থানেও এরা দিব্যি বেড়ে ওঠে।

তবে এফএওর গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের দুর্বল দিক এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-ওজন এবং দুধের পরিমাণ অন্যান্য ছাগলের চেয়ে কম। আফ্রিকার মাসাই ছাগল, ভারতের যমুনাপাড়ি ছাগল এবং চীনা জাতের ছাগলের মাংস ও দুধের পরিমাণ ব্ল্যাক বেঙ্গলের চেয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। তবে ওই তিন জাতের ছাগলের ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাচ্চা জন্মের পরই মারা যায়। কিন্তু ব্ল্যাক বেঙ্গলের বাচ্চার মৃত্যুর হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এ কারণে ব্ল্যাক বেঙ্গলের জীবনচক্রে মোট বংশবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। তাই বিজ্ঞানীরা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার বিচারে এটিকে সেরা জাত হিসেবে নির্বাচন করেছেন।
ছাগল পালন বাড়ছে: ছাগল পালন প্রযুক্তির দিক থেকেও বাংলাদেশ বেশ সফলতা দেখিয়েছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ২০০৮ সালে মাচায় ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং ছাগলের মৃত্যুহার কমানোর জন্য ‘লিফট’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ওয়েব ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা ওই প্রকল্পে ছাগলের মৃত্যুহার গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ সময়  ছাগলের সংখ্যাও বেড়েছে ৩০ শতাংশ এবং সারা দেশে উপজেলাপ্রতি ছাগলের সংখ্যা গড়ে ১৭১ শতাংশ বেড়েছে। সাধারণত মূত্র পায়ে লেগেই ছাগলের খুরা রোগ হয় এবং জীবনের ঝুঁকি বাড়ে। মাচা পদ্ধতিতে মূত্র নিচে পড়ে যাওয়ায় রোগের প্রকোপ কমে যায়।


Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes