মেহেরপুরে পতিত জমিতে বাদাম চাষে সাফল্য

অনুর্বর পতিত জমি চাষির জন্য সবসময় দুর্ভোগ বয়ে আনে এমন নয়, কখনও কখনও তার সুফলও থাকে। এর জন্য চাষিকে উদ্যমী হতে হয়। এটিই করে দেখিয়েছেন মেহেরপুরের সদর উপজেলার চাষিরা। পতিত অনুর্বর বালিমাটির জমিতে চিনাবাদাম চাষ করে সফলতা পেয়েছেন তারা। ফলন ও বাজার দর ভালো হওয়ায় দিন দিন এ এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাদাম চাষ।



সদর উপজেলার মদনাডাংগা,বেলতলাপাড়া, শ্যামপুর, টেংগারমাঠ ও গোপালপুর গ্রামের অধিকাংশ জমি বালি মাটির হওয়ায় চাষীরা অন্যান্য ফসল আবাদ করে খুব একটা লাভবান হতে পারেন না। ধান কাটার পর এ সব জমি সাধারণত ফাঁকা পড়ে থাকে। এ জন্য ৯০ দিনের ফসল হিসেবে অল্প খরচে বাদাম চাষ করেছেন চাষিরা। কৃষি বিভাগ থেকে জানা গেছে, গত ১৫-২০ বছর ধরে এখানে চিনাবাদামের চাষ হচ্ছে। তবে কী পরিমাণ জমিতে চিনাবাদাম চাষ হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

মদনাডাংগার বাদাম চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, বাদাম চাষ বেশ সহজ। ৯০ দিনের এই ফসলে অন্যান্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি। বাদাম জমিতে লাগানোর পরে কয়েকবার নিড়ানো (জমির ঘাস পরিষ্কার) ছাড়া আর কিছু করা লাগে না। অপর চাষি আলামিন হোসেন জানান, এবার প্রতিমণ বাদাম ২৪০০ থেকে ২৬০০ টাকায় বিক্রি করছি। যা গতবারের চেয়ে ৩০০থেকে  ৪০০ টাকা বেশি।

তিনি আরও বলেন, বাদাম চাষে খরচ কম লাভ বেশি। খরচ কম হওয়ায় আমাদের এলাকায় কৃষকরা অন্যান্য ফসলের চেয়ে চিনাবাদাম চাষ এবার বেশি করেছে।



বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ বাদাম বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকার উপরে।
স্থানীয় ও বাইরের বাজারেও বাদামের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে বাদাম চাষ করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, জেলার বিভিন্ন মাঠে চলতি মৌসুমে ৩০০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে। সদর উপজেলার মদনাডাঙ্গা, আলমপুর,বেলতলাপাড়া, শ্যামপুর ও গোপালপুর মাঠে বাদাম চাষ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
চাষিরা বলছেন, “বোরো ধানের মৌসুমে এসব মাঠের বেলে মাটিতে সেচ খরচ লাগে বেশি। জ্বালানি তেল, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে চাষ খরচ ওঠে না। তাই বোরো আবাদী জমিতেও অনেকে এখন বাদাম চাষ করছে। কাঁচা কিংবা ভাজা বাদাম খাওয়ার মজাই আলাদা। এর পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে বাদাম খাওয়ারও পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তাই বাদামের চাহিদাও রয়েছে বেশ ভাল। ক্রেতার চাহিদা আর জমির উর্ব্বর ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে বাড়ছে বাদাম চাষ।”
মদনাডাঙ্গা গ্রামের বাদাম চাষি আলামিন হোসেন জানান, বাদাম চাষে খরচ ও ঝুঁকি কম। শুধুমাত্র জমিতে চাষ দিয়ে বীজ পুতে দিলেই মোটামুটি ফলন আশা করা যায়। ৯০ দিনের এই ফসলে প্রতি বিঘায় খরচ মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। ফলন পাওয়া যায় বিঘা প্রতি আাট থেকে নয় মণ। সে হিসেবে বিঘা প্রতি লাভ হয় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা। তাছাড়া বাদামের গাছ উত্তম জ্বালানি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। অনেকে নিজের জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বাদামের গাছ ব্যবহার করছে। ফলে এখানেও অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। শুধু অনুর্ব্বর বেলে মাটিতেই নয়, আম ও লিচু বাগানের তলায় পতিত জমিতেও বাদামের চাষ হচ্ছে।

চাষিরা বলছেন, ফলজ বাগানে বাদাম আবাদ করলে একদিকে যেমনি বাড়তি অর্থ আসে তেমনি ফল গাছের পরিচর্যাও হয়। তাছাড়া অন্য ফসলের মত বাজার দর নিয়েও তেমন একটা চিন্তা থাকে না। ক্ষেত থেকেই কিনে যাচ্ছেন বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শেখ ইফতেখার হোসেন জানান, প্রতি বছর একই জমিতে একই রকম ফসল চাষে জমির উর্ব্বরা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। তাই চিনা বাদামের মত কিছু ফসল প্রতিটি জমিতেই মাঝে মাঝে চাষ করা উচিত। বাদাম চাষে কৃষককে উদ্বুদ্ধও করছে কৃষি বিভাগ।



গোপালপুর গ্রামের চাষি জামাল হোসেন বলেন, এক বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করতে আমাদের খরচ হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সেক্ষেত্রে ৭-৮ মণ ফলনে ১৪-১৮ হাজার টাকা ঘরে তুলতে পারি। যা অন্য ফসল থেকে পারি না।

মেহেরপুর বড় বাজারের বাদাম ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার মেহেরপুরে চিনাবাদামের আবাদ বেশি হয়েছে। চাষিরা বাজার দর ভালো পাচ্ছে। বর্তমানে আমরা বাদাম চাষিদের কাছ থেকে ক্রয় করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রয় করে লাভবান হচ্ছি। এ মৌসুমে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় প্রতিমণ বাদাম ক্রয় করছি।

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes