মেহেরপুরে সবজি চাষে কীটনাশকের পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’

মেহেরপুরের চাষিদের অর্থ উপার্জনের প্রধান উৎস সবজি চাষ। এখানে চাষ করা হয় বিভিন্ন মৌসুমী সবজি। এক সময় চাষিরা এসব সবজি উৎপাদনে কীটনাশক ব্যবহার করলেও এখন সেক্স ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ সহ বিভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহারে কমে এসেছে কীটনাশক ব্যবহার। উৎপাদন হচ্ছে বিষমুক্ত সবজি। এতে খরচ কমায় একদিকে যেমন কৃষকরা হচ্ছেন লাভবান অন্যদিকে ভোক্তারাও পাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর খাবার।

নিরাপদ সবজি উৎপাদনে জেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা দেয়ার কথা জানান মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক ড. মো. আক্তারুজ্জামান।

তবে চাষিদের অভিযোগ, কীটনাশকমুক্ত সবজির রং চকচকে না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না তারা।  তাই কীটনাশকমুক্ত সবজির আলাদা বাজার খোলার দাবি কৃষকদের।



এদিকে ফসলের ন্যায্যমূল্য পেতে কীটনাশকমুক্ত সবজি বিক্রির জন্য আলাদা বাজার স্থাপনে উদ্যোগ নেয় হচ্ছে বলে জানান জেলা মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি আবাদ হয়েছে।

মেহেরপুরে এবছর নিরাপদ সবজি চাষে আগ্রহ বাড়ছে চাষীদের। কীটনাশকের পরিবর্তে কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করায় কমেছে উৎপাদন খরচ। তবে, বিষমুক্ত সবজি বিপণনের আলাদা বাজার না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা। এদিকে, আগাম শীতের সবজিতে ছেয়ে গেছে মেহেরপুরের বাজার। ভাল দাম পাওয়ায় খুশি কৃষকরা। নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষকদের সবধরনের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।




মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রাম। যে দিকেই চেখ যায় দেখা মেলে একের পর এক সবজি ক্ষেত। আগে সবজি উৎপাদনে ব্যবহার করা হতো কীটনাশক। তবে, এবছর নিরাপদ সবজি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন চাষীরা।

সবজি ক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন চাষীরা। তারা বলছেন, এই পদ্ধতি ব্যবহারে কমেছে খরচ। বিষমুক্ত সবজি বিপণনে আলাদা বাজারের দাবি তাদের।

মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক কীটনাশক ছাড়াই চাষিরা তাদের ফসলি জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করছেন। ফসলের জন্য ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় থেকে ফসলকে রক্ষা করতে ‘‘ফেরোমন ট্র্যাপ’’ ব্যবহার করায় চাষিরা একদিকে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে। চাষিদের মধ্যে ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে পিএসকেএস নামক একটি বেসরকারি সংস্থা। প্রায় শতাধিক কৃষকের মধ্যে ২ হাজার ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ বিতরণ করা হয়েছে।

মেহেরপুরের সবজি এলাকা খ্যাত গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রাম। সরেজমিন ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, চাষিরা ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ ফাঁদ ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণ পোকা-মাকড় ধরছেন ওই ফাঁদে। চাষি হাফিজুর রহমান বলেন, ১২ মাস বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে থাকি। এবার উঠতি শীত মৌসুমে আড়াই বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করছেন, যা কীটনাশকমুক্ত। কীটনাশক ব্যবহার না করে একদিক থেকে যেমন তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, সেই সঙ্গে কীটনাশকমুক্ত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলাতে বিক্রি করতে পারছেন। এতে নিজের কাছে খুবই ভালো লাগছে।



একই গ্রামের সবজি চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, বাঁধাকপি ও ফুলকপি শীতকালীন সবজি হলেও আমাদের জেলাতে ১২ মাস ফসল হিসেবে চাষ হয়। আগে প্রতিদিনই কীটনাশক স্প্রে করতে হতো। পিএসকেএস সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী ‘‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ নামক পোকার ফাঁদ ব্যবহার করে কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে না। এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এখন আমরাও কীটনাশকমুক্ত খাবার খেতে পারছি। সেই সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে আমাদের উৎপাদিত সবজির কদর বাড়ছে।

কৃষক মিনকু মিয়া বলেন, অনেক টাকা ব্যয় করে আমরা সজবি উৎপাদন করতাম। এই সবজির ওপর আমাদের সংসার চলে। প্রথমে এই প্রযুক্তির কথা যখন শুনি, তখন এটা নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। কারণ যদি এই প্রযুক্তি কাজ না করে তাহলে আমাদের পথে বসতে হতো। কৃষিবিদ রবিউল ইসলাম আমাদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে এ ফাঁদ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তার পরামর্শ কাজে লাগিয়ে কৃষিতে আরো সমৃদ্ধ হচ্ছি। এখন অনেকেই জমিতে ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ ব্যবহার করতে আগ্রহী হচ্ছে।


কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম বলেন, যে কোনো ফসলই উঠতি বয়সে পোকার আক্রমণটা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সবজিতে মাঝরা পোকার আক্রমণটা বেশি। ‘‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ মাঝরা পোকার আক্রমণ থেকে শতভাগ নিরাপদ। কারণ এ ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’এ  একটি লিয়র ব্যবহার করা হয়। এ লিয়রে এক প্রকার সুগন্ধি স্প্রে করা থাকে, যে সুগন্ধি রানী পোকার শরীর থেকে পাওয়া যায়। সে সুগন্ধিতে পুরুষ পোকাদের আকৃষ্ট করে। লিয়রের নিচে থাকে সাবানযুক্ত পানি। গন্ধে পোকা ভেতরে প্রবেশ করলে পোকা-মাকড় আটকিয়ে থাকে। দু’একদিন পরপর তা পরিষ্কার করার প্রয়োজন পড়ে। পলাশীপাড়া সমাজকল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের মানুষের চাহিদার প্রায় অর্ধেক সবজি মেহেরপুর জেলার চাষিরা উৎপাদন করে থাকে। এ জেলার কৃষকের উৎপাদিত সবজির অনেক কদর রয়েছে। আর এ সবজি যদি হয় কীটনাশকমুক্ত, তাহলে এ জেলার কৃষকরা কৃষিতে বিপ্লব ঘটাবেন।
সমিতির প্রধান সমন্বয়কারী কামরুল আলম বলেন, আমরা যেসব কৃষককে ফেরমন ট্র্যাপ দিয়েছি তাদের সবাইকেই কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষে এ ফাঁদের ব্যবহার নিশ্চিত করে। পরে তারা এই প্রযুক্তির সুফলও পাচ্ছেন।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান জানান, এই ফাঁদটি পরিবেশবান্ধব। কীটনাশক শুধু ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় নিধন করে না, ফসলের জন্য উপকারী পোকারও ক্ষতি করে। তাই এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারলে সবজি চাষে আরো সফলতা আসবে


Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes