জলবায়ুর পরিবতর্নে মারাত্বক ঝুঁকিতে মেহেরপুরের কৃষি


সাম্প্রতিক  জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত কারণে বে-সামাল হয়ে উঠেছে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিপর্যস্ত অবস্থার মুখোমুখি আমাদের কৃষি কর্মকান্ড। নদীর গভীরতা কমে উচ্চতা বৃদ্ধিসহ গতিপথ পরিবর্তন, বনভূমি উজাড়, জলাভূমি বিরানভূমিতে পরিনত হওয়া, ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি, পানির লেয়ার স্বাভাবিকের তুলনায় হ্রাস পাওয়া এবং ক্ষতিকারক কার্বন গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত উদগীরণের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যপক পরিবর্তন ঘটেছে। এ পরিবর্তন সর্বাধিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি এনে দিয়েছে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে

সিডর, নার্গিস, আয়লার মতো প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, রাজধানীতে বহুতল ভবনে ফাটলের চিহ্ন, কোন প্রকার ভূ-কম্পন ছাড়াই ভবন ধ্বসে পড়ার বিষয়টি মোটেও সুখের নয়। শুস্ক আবহাওয়ায় সমভূমির উপর দিয়ে টর্নেডোর মতো ঝড় বয়ে যাওয়া এবং বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টিপাত না হওয়া আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের লক্ষণ। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত গবেষনায় বেরিয়ে এসেছে বিশ্বের ঝুকিপূর্ণ ১১টি দেশের নাম। তবে আতঙ্কের বিষয় এ তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে সবার শির্ষে।

দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটির উর্দ্ধে। এই জনসংখ্যার খাদ্য যোগান দিতে গিয়েই কৃষককে হতে হচ্ছে নাজেহাল। বর্ত মান রেট অনুযায়ী  বৃদ্ধি পেলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য সংখ্যা হবে ১৯ কোটি। ২০২৫ সালের ১৯ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা হবে আরো কঠিনতম কাজ। এই সময়ে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইরের দেশ থেকে অতি উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসলের বীজ  আমদানী করতে হবে। সেই সাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে উচ্চ মাত্রার রোগ-বালাই। এসব রোগ বালাই দমনে আসবে উচ্চ মাত্রার রোগনাশক ও কীটনাশক।


বিশেষজ্ঞদের মতে ভারত র্কতৃক উজানে বাধ নির্মানের মাধ্যমে বিভিন্ন নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এরই মাঝে হারিয়ে যাবে বাংলাদেশের সবকটি নদীর নাব্যতা। মিঠা পানির পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদী ও খালে প্রবেশ করবে সাগরের লবনাক্ত পানি। একদিকে রোগ-বালাই অপরদিকে পানির লবনাক্ততা ঠেকাতে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়বে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা।

আমাদের দেশের  কৃষিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কৃষকের অভাব। লেখাপড়া শিখে কেউই  এদেশে কৃষিকাজ করতে চায় না। কৃশিকাজকে এদেশের মানুষ ছোটলোকের কাজ হিসাবে চেনে । যদিও এই ছোটলোকদের কারণেই শিক্ষিত ও ভদ্র শেণী খেতে পায় । কিন্তু অশিক্ষিত, অসম সাহসিক, ত্যাগী, পরিশমী কিন্তু মূর্খ  এই কৃষক শেণীর অজ্ঞতার কারণে মাটির জন্য প্রযোজ্য একটি দুটি খাবার অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে তা উপকারের স্থলে ক্ষতির কারণই হচ্ছে বেশি।

জনসংখ্যার চাহিদানুযায়ী খাদ্য উৎপাদন করতে যেয়ে কৃষককে রাষায়নিক সার ও কীটনাশকের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কৃষক জমিতে বীজ বপনের সময় মন্ত্রের  মতো ধরেই নেয় তাকে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ চাষ করতে যেয়ে প্রকাশ পাচ্ছে কৃষকের অজ্ঞতা। কৃষক তার জমিতে সার ব্যবহার করছে তবে অসম মাত্রায়। সুষম সার ব্যবহার না হওয়ায় মাটিতে নানা রোগ জন্মলাভ করছে। ফসল  আক্রান্ত হচ্ছে নানা ক্ষতিকারক পোকায়। পোকা ও রোগ দমন করতে যেয়ে জমিতে ব্যবহার হচ্ছে উচ্চ মাত্রার রোগনাশক ও কীটনাশক। এসব রোগ নাশক কখনও পরিকল্পিত আবার কখনও অপরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার হচ্ছে। অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এর বিরুপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটছে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর। হুমকীর সম্মুখিন হচ্ছে জীববৈচিত্র


সর্বাধিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে আমাদের মৎস্য সম্পদ। পশু ও বনজ সম্পদও রেহাই পাচ্ছে না এর ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে। বর্তমানে দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা আগের যে কোন সময়ের তুলনায় জটিল। কেবল অধিক খাদ্য উৎপাদন নয়, মান সম্মত শষ্য উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উজানের দেশগুলি নদীর গতিপথ পরিবর্তনের প্রতিযোগীতায় নেমেছে। এর ফলে আমাদের নদী মাতৃক দেশ হারিয়েছে নাব্যতা। বিরানভূমিতে পরিনত হচ্ছে আমাদের জলাভূমি। নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং তলা ভরাট হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত করছে সমভূমি। এর ফলে ঘটছে ফসল হানি।

অপর দিকে শুস্ক মৌসুমে নদীসহ সব ধরণের জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় পানির লেয়ার ক্রম নিম্নমুখী হতে হতে সেচ যন্ত্র অচল হতে চলেছে। অগভির সেচ এলাকায় গভীর নলকুপ স্থাপনের ফলে ভূ-অভ্যান্তর দিয়ে প্রবেশ করছে লবন-পানি। ইতোমধ্যে মাগুড়ার সীমানায় লবন-পানির অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে জানাগেছে সংবাদপত্র সুত্রে। একই সাথে বাড়ছে আর্সেনিকের প্রভাব। আর এই আর্সেনিকের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত জেলা মেহেরপুর । বর্তমানে মেহেরপুরে  আয়রন ও আর্সেনিক মুক্ত পানির বড় আভাব । জনসংখ্যার দ্রুত বর্ধন,মেচের জন্য গভীর নলকুপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যাবহার, উচ্চফলনশীল বীজ চাষ, উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, প্রতিবেশি দেশগুলোর যথেচ্ছা নদী ব্যবহার, দেশীয় নদীর নাব্যতা হারানো, লবনাক্ত ও আর্সেনিকযুক্ত পানি প্রবেশের হুমকী এবং বিশ্ববাজারের কালো হাতছানি আমাদের কৃষিকে বিষিয়ে তুলছে। এ অবস্থায় ২০২৫ সালের দেশীয় খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষি কর্মকান্ডের মূল গতিধারায় পরিবর্তন আসা দরকার।

অস্বাভাবিক তাপমাত্রা

বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণ সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২.৩° সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মে তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয় ৪৫.১° সেলসিয়াস, রাজশাহীতে। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে এসে নথিভুক্ত করা হয় ৪৩° সেলসিয়াস। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ এপ্রিল নথিভুক্ত করা হয় বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.২° সেলসিয়াস, তাপমাত্রার এই পরিসংখ্যানে আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হচ্ছে তাপমাত্রা কমছে, কিন্তু বস্ত‌ুত, অতীতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিলো কম, অথচ বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি। কেননা, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড বা WWF-এর গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরেই মে মাসের গড় তাপমাত্রা ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ঐ মাসের তুলনায় বেড়েছে ১° সেলসিয়াস (প্রেক্ষিত)৷ নভেম্বর মাসে এই তাপমাত্রা ১৪ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ০.৫° সেলসিয়াস৷আবহাওয়া অধিদপ্তরসূত্রে জানা যায় গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ০.৫%। এমনকি ২০৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪° সেলসিয়াস এবং ২১০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ২.৪° সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মেহেরপুরে আবহাওয়া বিভাগের অফিস না থাকায় পাশ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার তাপমাত্রাকে ধরে আমাদের তাপমাত্রা গণনা করা হয়ে থাকে।  যেখানে এই জেলার তাপমাত্রা মাঝে মাঝেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে ফেলে। সেই সাথে বিদ্যুতের ঘাটতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবকবার বিপর্যস্থ  এই অঞ্চলের   সাধারণ কৃষক শেনী ও মানুষ।


সুপেয় পানির অভাব
২০০৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরির্বতন-সংক্রান্ত প্যানেলের (IPCC) পানিসম্পদের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ সমুদ্রতীরের বেশ কটি দেশে সামনের দিনে মিঠা পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। ২০২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এ সমস্যা ভয়াবহ রূপ নেবে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাওয়ায় অনেক এলাকায় দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির অভাব। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে এই অভাব প্রকট।  মেহেরপুর  জেলাের ৩টি উপজেলার মধ্যে সদর উপজেলার প্রায় সবকটিতে গ্রামেই  ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাওয়ায় স্বাভাবিক নলকূপগুলো  প্রায়ই অকেজো  হয়ে পড়ছে, ফলে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট । সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সদর উপজেলার টেঙারমাঠ, বেলতলাপাড়া, আলমপুর ইত্যাদি গ্রামের মানুষের । যেখানে সুপেয় পানির খুবই অভাব।  কিন্তু গরীব  এবং  অশিক্ষিত মানুষ বাধ্য হয়ে  আর্সেনিক যুক্ত টিউবয়েলের  পানি পানি করে মারাত্বক সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে । শুষ্ক মৌসুমে এমনিতেই যেখানে পানির স্তর হ্রাস পায়, তার উপর ঐসময় গাছপালার প্রস্বেদন বেড়ে যাওয়ায় ভূগর্ভের সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে।


ঘুর্ণিঝড় বা টর্নেডো
মেহেরপুরে মানুষ টর্নেডো নামটি অনেকেই শোনেনি কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে আজকাল প্রায়ই মেহেরপুর আঘাত হানছে টর্ণেডো নামক প্রয়লংকরী ঝড়টি  যার প্রভাবে  ক্ষতিও হচ্ছে মারাত্বক । জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) ‘দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণ’ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত ঝুঁকির ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে শীর্ষে দেখানো হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে বছরে প্রতি লাখে প্রায় ৩৩ জন মারা যাচ্ছে। স্থলভাগে ঘুর্ণিবায়ু বা ঘুর্ণিঝড় বা টর্নেডোর আঘাত এখন প্রায় নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অকষ্মাৎ ঘুর্ণিবায়ু আঘাত হানে দেশের বিভিন্ন জায়গায়।



সমুদ্রস্তরের উচ্চতাবৃদ্ধি এবং উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ায় সূর্যের তাপে তুলনামূলক ঘন লোনাপানি বেশি তাপ শোষণ করে গরম হয়ে উঠে এবং অতিবেগুনী রশ্মি বিকিরণ করে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে লবণাক্ততা-আক্রান্ত উপকূলাঞ্চল তুলনামূলক গরম হয়ে উঠছে দিনে দিনে। গাছ কম থাকার কারণে এবং পানি দীর্ঘক্ষণ তাপ ধরে রাখায় এই গরম স্থায়িত্ব পায়। এধরণের সীমিত অঞ্চলভিত্তিক আবহাওয়াগত পরিবর্তন আঞ্চলিক টর্নেডো ডেকে আনছে।

শিলাবৃষ্টি
দিনে দিনে শিলাবৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে  মেহেরপুর অঞ্চলে । প্রতি বৈশাখে সাধারণত প্রাকৃতিক স্বাভাবিক কারণেই মাঝে মাঝে শিলাবৃষ্টি হয় এদেশে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে । তাছাড়া ইদানিং শিলাবৃষ্টির শিলার আকৃতিও দিনে দিনে বড় হয়ে যাচ্ছে।  এবছরে শিলাবৃষ্টি   ও টর্ণেরডোর আঘাতে বার বার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মেহেরপুরের বহু গ্রমের গরীব মানুষ ও কৃষক । এলাকার অধিকাংশ টিন ও খড়ের ঘরের চাল পর্যন্ত বিধ্বস্থ হয়ে যায়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, অনেক লোকজন ও গবাদি পশু আহত হয়। নষ্ট হয়ে যায় আম ও লিচুর আবাদ, ক্ষতিগ্রস্থ হয়  ধান, তামাক, ভুট্টা আর বোরোক্ষেত। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এর আগে এতো বড় শিলার আঘাত তারা কষ্মিনকালেও শোনেননি।

Share this:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Copyright © মেহেরপুর ২৪. Designed by OddThemes